চুনিমুখী মৌটুসি | Ruby cheeked Sunbird | Anthreptes singalensis

0
701

bp040114ছবি: গুগল|

আকাশপ্রদীপ নিবুনিবু করছে। প্রাণীকুল যে যার ডেরায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দিন-রাতের সন্ধিক্ষণের শেষ মুহূর্তে আকাশটা কেঁপে উঠল ভীমগর্জে। নিশ্চয়ই দূরে কোথাও বজ ভূপতিত হয়েছে। খানিকটা ভড়কে গিয়েছি। কালবৈশাখীর তাণ্ডব শুরু হয়ে যাবে একটু বাদেই। যত দ্রুত সম্ভব নিরাপদে ফেরা চাই। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি, এর আগেই ঝড়ো হাওয়াসহ বজ বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। উপায়ান্তর না দেখে নিজ গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছি। সেখানে দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি টের পাইনি, পেয়েছি ছোট্ট পাখি ‘চুনিমুখী মৌটুসি’র সাক্ষাৎ। জানালার কার্নিশে আশ্রয় নিয়েছে। হাত বাড়িয়ে বাহারি রংয়ের পাখিটাকে স্পর্শ করলাম। উড়তে পারছে না বেচারি। ডানায় সুতাজাতীয় তন্তু পেঁচিয়েছে। ধীরে ধীরে প্যাঁচ খুলে দিতেই পাখিটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।

প্রিয় পাঠক, এরা অতিপরিচিত পাখি। দেশের স্থায়ী বাসিন্দা। দেখা মেলে যত্রতত্র। গ্রামগঞ্জের ঝোপ-জঙ্গলে নিশ্চিত বিচরণ লক্ষ্য করা যায়। বাড়ির আশপাশের ঝোপের ভেতর থেকে উচ্চৈঃস্বরে ‘সুইটি-টি-চি-চিউ… টিউসি-টিটসুইটি-সুইটি… সুইটি-টি-চি-চিউ…’ সুরে শিস দেয়। এরা অত্যন্ত চঞ্চল ও ফুর্তিবাজ স্বভাবের। দিনের বেশির ভাগ সময় গাছের শাখা-প্রশাখায় নেচে বেড়ায়। প্রজনন মৌসুমে জোড়ায় জোড়ায় দেখা যায়। এ প্রজাতি বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার, চীন, কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম, ব্রুনাই, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় দেখা যায়। এসব অঞ্চলের স্থায়ী বাসিন্দা এরা। বিশ্বে এ প্রজাতির সংখ্যা মোটামুটি সন্তোষজনক। স্থিতিশীলও বলা যায়। এদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পায়নি। আইইউসিএন এ প্রজাতিটিকে নূ্যনতম বিপদগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দেশে সুলভ দর্শনের কারণে বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এদের সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়নি।

এ পাখির বাংলা নাম: ‘চুনিমুখী মৌটুসি’, ইংরেজি নাম: ‘রুবি-চিকড সানবার্ড’ (Ruby-cheeked Sunbird), বৈজ্ঞানিক নাম: ‘অ্যানথ্রেপটেস সিঙ্গালেনসিস’ (Anthreptes singalensis) |

এরা লম্বায় ১১-১২ সেন্টিমিটার। পুরুষ পাখির মাথার তালু, ঘাড়, পিঠ, কোমর ও লেজের উপরিভাগ ধাতব সবুজ। ডানা ও লেজ কালচে। গাল টকটকে লাল, সূর্যালোকে বেগুনি বিচ্ছুরণ বের হয়। গলা ও বুক লালচে-কমলা। পেট উজ্জ্বল হলুদ। অন্যদিকে, স্ত্রী পাখির পিঠের বর্ণ নিষ্প্রভ জলপাই সবুজ। গলা ও বুক লালচে-কমলা। গালে লাল রংয়ের উপস্থিতি নেই, নেই পেটের হলুদ বর্ণও। উভয়েরই ঠোঁট কালচে, খাটো ও সোজা। পা সবুজ-ধূসর।

এ পাখির প্রধান খাদ্য ফুলের মধু ও ছোট পোকামাকড়। প্রজনন মৌসুম মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত। ভূমি থেকে ২ মিটার উঁচুতে গাছের ডালে অথবা লতা আচ্ছাদিত গাছের ডালে থলে আকৃতির বাসা বাঁধে। ডিম পাড়ে ২টি। ফুটতে সময় লাগে ১৫-১৭ দিন।

লেখক: আলম শাইন। কথাসাহিত্যিক, কলাম লেখক, বন্যপ্রাণী বিশারদ ও পরিবেশবিদ।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন, 04/01/2014