কালিম পাখি | Purple Swamphen | Porphyrio porphyrio

3020

ছবি: গুগল |

অনেকের ধারণা এরা অতিথি পাখি। ধারণাটি রটিয়ে দেয়ার জনক পাখি শিকারিরাই। কারণ অতিথি পাখির নাম শুনলে ভোজন রসিকদের জিভে জল আসে। তখন বিক্রি করতে সুবিধা হয়। দাম-টামও বেশি পাওয়া যায়। প্রকৃত তথ্যটি হচ্ছে, এরা আমাদের দেশীয় জলচর পাখি। স্বভাবে বুনো হলেও মোটামুটি পোষ মানে। মুক্ত অবস্থায় এরা দলবদ্ধভাবে বিচরণ করে। আবার একাকী বা জোড়ায় জোড়ায়ও বিচরণ করে। ওদের বিচরণের ক্ষেত্র জলাশয়ের জলদামের ওপর। আবার জলেও সাঁতার কাটে, তবে তুলনামূলকভাবে কম। জলকেলি ওদের ভীষণ পছন্দ। জলের ছোঁয়ায় রূপের ঝলক আরো বেড়ে যায়। এ সুন্দর প্রজাতির পাখিদের বছর ত্রিশেক আগেও দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলাশয়ে কিংবা হাওর অঞ্চলে প্রচুর সংখ্যায় দেখা যেত। বর্তমানে এদের সাক্ষাৎ ওভাবে মেলে না। গত বর্ষায় আমি দেখেছি বিক্রমপুরের রামপালে।

ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে পাখি দেখতে বেরিয়েছি এক বিকেলে। হাঁটতে হাঁটতে রাজা বল্লাল সেনের দিঘির পাড়ে হাজির হলাম। দেখতে পেলাম দিঘিটার আকার আকৃতি আগের মতো নেই। জলজ উদ্ভিদ বা জলদামের কারণে এটি এখন বিলে পরিণত হয়েছে। তার পরও এখানে কিছু জলচর পাখির দেখা মেলে। পাখি বিশেষজ্ঞরাও মাঝে মধ্যে এখানে পাখি পর্যবেক্ষণে আসেন। মাঝে মধ্যে আমিও যাই। সেদিনও গিয়েছি। কয়েক প্রজাতির পাখির সাক্ষাৎ পেলেও এ পাখির প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ হয়েছে বেশি। দূর থেকে দেখতে পেয়েছি দুটি জলচর পাখি জলদামের ওপর হেঁটে বেড়াচ্ছে। আবার কিছুক্ষণ পর পর বিরতি নিয়ে ওড়াউড়ি করছে। দৃশ্যটি বেশ লেগেছে আমার কাছে। সঙ্গে সঙ্গে বাইনোকুলারের আইপিসে চোখ লাগিয়ে ওদের প্রজাতি শনাক্ত করে নিয়েছি। পাখিগুলো পূর্ব পরিচিত বিধায় ওদের পেছন আর অযথা সময় নষ্ট করিনি। বলতে দ্বিধা নেই, এ পাখি আমি নিজেও ক’দিন পুষেছি। আবার খাঁচার দরজা উন্মুক্ত করে ওদের প্রকৃতির কোলে ফিরিয়েও দিয়েছি।

এ পাখির বাংলা নাম: ‘কালিম,’ ইংরেজি নাম: ‘পার্পল সোয়াম্পহেন’(Purple Swamphen) বৈজ্ঞানিক নাম: ‘পরফাইরিও পরফাইরিও’ (Porphyrio porphyrio), গোত্রের নাম: ‘রাললিদি’।

এরা লম্বায় ৪৫-৫০ সেন্টিমিটার। ঠোট, কপাল পালকহীন উজ্জ্বল লাল। মাথা থেকে গলা হালকা নীলাভ বর্ণ। এ ছাড়া সমস্ত শরীরের পালক বেগুনি-নীলের মিশেল। লেজের তলা সাদা। পা ময়লা লাল। পায়ের আঙ্গুল তুলনামূলকভাবে বড়। দেখতে নোংরা মনে হয়। স্ত্রী-পুরুষ পাখি দেখতে একই রকম। তবে স্ত্রী পাখি সামান্য ছোট। এরা ডিম পাড়ে ৩-৬টি। ডিম ফুটতে সময় লাগে ১৮-২০ দিন। ডিমে তা দেয়ার দায়িত্ব স্ত্রী পাখির ওপরে বর্তালেও ওই সময়ে পুরুষ পাখিটি বাসার কাছাকাছি থেকে স্ত্রী পাখিকে সঙ্গ দেয়।

লেখক: আলম শাইন। কথাসাহিত্যিক, কলামলেখক, বন্যপ্রাণী বিশারদ ও পরিবেশবিদ।
সূত্র: দৈনিক মানবকণ্ঠ, 30/11/2012