পাহাড়ি নীলকণ্ঠ | Dollarbird | Eurystomus orientalis

1270

ছবি: গুগল |

দুর্লভ দর্শন। পরিযায়ী পাখি। আমাদের দেশে প্রজনন সময়ে (গ্রীষ্মকালে) দেখা মেলে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, সিলেটের চিরসবুজ অরণ্যে এদের দেখা যায়। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউগিনিতে পরিযায়ী পাখির বিস্তৃতি রয়েছে। এরা আমাদের দেশে মহাবিপন্ন বলে বিবেচিত হয়েছে। তবে বিশ্বে বিপন্মুক্ত। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতি সংরক্ষিত রয়েছে। এদের কণ্ঠস্বর কর্কশ। ডাকে ‘ক্যাক.. ক্যাক’ সুরে। ওড়ার সময় ডাকে ‘ক-চক-চক-চক’ সুরে।

পাখিটাকে প্রথম দেখি সিলেটের শ্রীমঙ্গলে। চা বাগানের ভেতরে উঁচু একটা গাছের মগডালে বসে রয়েছে। দেখতে খানিকটা সমস্যা বোধ করেছি। বাইনোকুলারের আইপিসে চোখ লাগিয়েও প্রজাতি শনাক্ত করতে কষ্ট হয়েছে। পরক্ষণে চিনতে পেরে বেশ উত্তেজিত বোধ করেছি সেদিন। অধিক উত্তেজনা নিয়েই দ্রুত টুকিটাকি লিখে নিয়েছি। নোট নেয়া শেষ হতেই অসুস্থ শরীরে সুস্থতার ইঙ্গিত পেয়ে গেছি মহূর্তেই। প্রিয় পাঠক, হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গেছি বছর পাঁচেক আগে। হৃদযন্ত্রে গোলমাল দেখা দিয়েছে। ছুটে গেলাম হৃদরোগ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. একেএম মনওয়ারুল ইসলামের শ্যামলীর প্রাইভেট চেম্বারে (তিনি তখন কর্মরত ছিলেন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও সোহ্রাওয়ার্দী হাসপাতাল কমপ্লেক্স ঢাকাতে, বর্তমানে আছেন যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে)। তিনি আমার রোগ শনাক্ত করছেন ঠিকই, তবে সেটি হৃদযন্ত্রে না হওয়াতে চিকিৎসার ভিজিট নেননি। বলে রাখা ভালো, তিনি আমার পরিচিত কেউ নন। প্রিয় পাঠক, এমন ডাক্তার এ দেশেও আছেন, তা-কি চিন্তা করতে পারি আমরা! ডাক্তার সাহেব সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘আপনার হৃদযন্ত্রে সমস্যা নেই, প্রকৃতির কাছাকাছি ছুটে যান, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি প্রকৃতিকে ভালোবাসি। তাই আমার রোগীদের বলি প্রকৃতির কাছে যেতে।’ সেই অজুহাতে ওই সময় শ্রীমঙ্গল থেকে ঘুরে আসার সুযোগ হয় এবং এমন সুন্দরতম বিরল দর্শন পাখিটার সাক্ষাত পাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করি।

পাখির বাংলা নাম: ‘পাহাড়ি নীলকণ্ঠ’, ইংরেজি নাম: ‘ডলারবার্ড’ (Dollarbird), বৈজ্ঞানিক নাম: Eurystomus orientalis, পরিযায়ী। আমাদের দেশে নীলকণ্ঠ এবং পাহাড়ি নীলকণ্ঠ নামক দুই প্রজাতির পাখির দেখা মেলে।

লম্বায় ৩০ সেন্টিমিটার। ওজন ১৫০ গ্রাম। ঠোঁট কমলা লাল। মাথা কালচে-বাদামি। গলা থেকে নীলাভ আভা ঠিকরে বের হয়। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহের পালক কালচে নীল। ওড়ার পালক কালচে-বাদামি। ডানার প্রান্ত পালকের গোড়া রূপালী-সাদা। চোখের বলয় হলদে-বাদামি। পা ও পায়ের পাতা লাল। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। অপ্রাপ্ত বয়স্কদের চেহারা ভিন্ন। এদের ঠোঁট অনুজ্জ্বল।

প্রধান খাবার উড়ন্ত পোকামাকড়। এরা উড়ে উড়েই শিকার ধরে। প্রজনন সময় মার্চ থেকে জুন। বাসা বাঁধে গাছের কোটরে কিংবা পাহাড়ের প্রাকৃতিক গর্তে। ডিম পাড়ে ৩-৪টি। ডিম ফুটতে সময় লাগে ১৭-২০ দিন। শাবক স্বাবলম্বী হতে সময় লাগে ৩০-৩৫ দিন।

লেখক: আলম শাইন। কথাসাহিত্যিক, কলামলেখক, বন্যপ্রাণী বিশারদ ও পরিবেশবিদ।
সূত্র: দৈনিক মানবকণ্ঠ, 04/10/2013